সোমবার ২৭ জুলাই ২০২৬ - ১১:২৯
আরবাঈন ও সভ্যতামুখী মানুষের পুনর্জাগরণ

আরবাঈন পশ্চিমা সভ্যতার ভোগবাদী মানুষের বিপরীতে এক ভিন্ন মানবিক আদর্শ উপস্থাপন করে-এমন এক মানুষ, যার মূল্য সম্পদ দিয়ে নয়, বরং সেবা, আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধ দিয়ে নির্ধারিত হয়। এই জীবন্ত অভিজ্ঞতা দেখায় যে, আধ্যাত্মিক পুঁজি বাজারকেন্দ্রিক যুক্তি ছাড়াই একটি বৃহৎ সমাজকে সংগঠিত করতে পারে এবং দায়িত্বশীল সভ্যতামুখী মানুষ গড়ে তুলতে সক্ষম।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমান যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-সভ্যতাগুলো কেমন ধরনের মানুষ তৈরি করে? প্রতিটি সভ্যতা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি হওয়ার আগেই মানুষের একটি নির্দিষ্ট ধারণা উপস্থাপন করে এবং সেই ধারণার ভিত্তিতেই জীবনধারা ও মূল্যবোধের কাঠামো গড়ে তোলে। যদি আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা সাম্প্রতিক দশকগুলোতে প্রধানত ভোগবাদী মানুষ সৃষ্টি করে থাকে, তবে আরবাঈনকে ইসলামী বিশ্বের সভ্যতামুখী মানুষ গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা যেতে পারে।

ভোগবাদী মানুষের পরিচয় মূলত নির্ধারিত হয় ভোগ, আরাম-আয়েশ, ব্যক্তিগত আনন্দ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক পছন্দের মাধ্যমে। তার সাফল্য বিচার করা হয় সম্পদ, ক্রয়ক্ষমতা কিংবা জীবনযাত্রার মান দিয়ে। সামাজিক সম্পর্কও প্রধানত প্রতিযোগিতা ও ব্যক্তিস্বার্থকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এ ধরনের ব্যবস্থায় মানুষ সমাজের একজন দায়িত্বশীল সদস্য বা কোনো আদর্শের ধারক হওয়ার পরিবর্তে একজন ভোক্তায় পরিণত হয়-যার জন্য ক্রমাগত নতুন নতুন চাহিদা সৃষ্টি করা হয়, যাতে বাজার ও অর্থনীতির চাকা সচল থাকে।

অন্যদিকে, আরবাঈনের পদযাত্রা মানুষের এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। এই কোটি মানুষের সমাবেশে মানুষের মর্যাদা তার সম্পদ বা সামাজিক অবস্থান দিয়ে নয়, বরং তার সেবা, আত্মত্যাগ এবং দায়িত্ববোধ দিয়ে নির্ধারিত হয়। যে ব্যক্তি নিঃস্বার্থভাবে যাত্রীদের সেবা করে, যে চিকিৎসক স্বেচ্ছায় চিকিৎসাসেবা দেন, যে কিশোর যাত্রীদের জুতা গুছিয়ে রাখে কিংবা যে পরিবার নিজেদের ঘর যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়-তারা সবাই সামাজিক মর্যাদার ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। এখানে মানুষের সম্মান অর্জিত হয় অর্জনের মাধ্যমে নয়, বরং দানের মাধ্যমে।

এই পার্থক্য কেবল নৈতিকতার নয়; এটি দুটি ভিন্ন সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। যে সভ্যতা মানুষকে অর্থনৈতিক সত্তা ও ভোক্তা হিসেবে দেখে, সে সামাজিক সম্পর্ককে লাভ ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে তোলে। কিন্তু যে সভ্যতা মানুষকে দায়িত্বশীল এবং আল্লাহপ্রদত্ত মর্যাদাসম্পন্ন সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে, সেখানে সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং আত্মত্যাগ সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। প্রতি বছর আরবাঈন লক্ষ লক্ষ মানুষকে এমন এক অভিজ্ঞতার মধ্যে নিয়ে যায়, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থের পরিবর্তে সেবা, প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার পরিবর্তে সামষ্টিক দায়িত্ব গুরুত্ব পায়।

আরবাঈনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এই পরিবর্তন কেবল তত্ত্বে নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। এই অভিজ্ঞতায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি ধর্মীয় মূল্যবোধকে কেবল শোনে না, বরং তা নিজের জীবন ও আচরণের মধ্যে অনুভব করে। তিনি সেবাদাতাদের আচরণে উদারতা দেখেন, বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে পথচলায় ভ্রাতৃত্ব অনুভব করেন এবং হাজারো স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সামাজিক দায়িত্ববোধকে প্রত্যক্ষ করেন। তাই আরবাঈন শুধু মূল্যবোধের প্রচার করে না; বরং সেগুলোকে সামাজিক জীবনের বাস্তব চর্চায় রূপ দেয় এবং সমষ্টিগত জীবনধারার আদর্শে পরিণত করে।

সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও আরবাঈন একটি বিরল ঘটনা। এমন এক বিশ্বে, যেখানে অধিকাংশ সামাজিক সম্পর্ক অর্থনৈতিক চুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল, সেখানে আরবাঈন দেখায় যে বিশ্বাস, আস্থা এবং সামাজিক পুঁজিও একটি বৃহৎ সমাজকে সংগঠিত করতে পারে। লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য খাদ্য, আশ্রয়, পরিবহন এবং অন্যান্য সেবা কোনো বাজারভিত্তিক লেনদেন বা আর্থিক লাভের প্রত্যাশা ছাড়াই প্রদান করা হয়। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে মানবসমাজ কেবল অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয় না; আধ্যাত্মিক সম্পদও সামাজিক সংগঠনের শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে।

এই কারণেই আরবাঈনকে কেবল একটি ধর্মীয় আচার হিসেবে বিশ্লেষণ করা যথেষ্ট নয়। এটি প্রতি বছর ইসলামী বিশ্বের সভ্যতাগত সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে-যেখানে মানুষ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা বা অর্থনৈতিক প্রণোদনা ছাড়াই একটি অভিন্ন আদর্শকে কেন্দ্র করে একত্রিত হয়। এমন অভিজ্ঞতা সামষ্টিক পরিচয়, পারস্পরিক আস্থা এবং ইসলামী উম্মাহর সংহতি জোরদারে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে কাজ করতে পারে।

আরবাঈনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো মানুষকে আবারও সক্রিয় সামাজিক ভূমিকার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা। সভ্যতামুখী মানুষ কেবল ব্যক্তিগত কল্যাণের কথা চিন্তা করে না; বরং সমাজ ও উম্মাহর ভবিষ্যতের প্রতি নিজেকে দায়িত্বশীল মনে করে। তার কাছে ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্ব, আধ্যাত্মিকতা ও ন্যায়বিচার, ঈমান ও সামাজিক কর্মকাণ্ড-এগুলোর মধ্যে কোনো বিচ্ছেদ নেই। তাই আরবাঈন শুধু ধর্মপ্রাণ মানুষ তৈরি করে না; বরং এমন মানুষ গড়ে তোলে, যারা ন্যায়ভিত্তিক ও নৈতিক সমাজ নির্মাণে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত।

এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বের বহু সমাজ অর্থহীনতার সংকট, ক্রমবর্ধমান একাকীত্ব, জনআস্থার অবক্ষয় এবং সামাজিক পুঁজির ক্ষয়ের মুখোমুখি, তখন আরবাঈন সমকালীন মানুষের সামনে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা উপস্থাপন করে। এই বিশাল সমাবেশ দেখিয়ে দেয় যে মানুষ এখনো অর্থপূর্ণ জীবন, অন্তর্ভুক্তি, সহমর্মিতা ও সেবার জন্য আকুল। উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হলে মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার সীমা অতিক্রম করে একটি বৃহৎ সামষ্টিক অভিজ্ঞতার অংশীদার হতে পারে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে আরবাঈনকে সমকালীন বিশ্বে সভ্যতামুখী মানুষের পুনর্জাগরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এই মানুষ দায়িত্ববোধ, সহযোগিতার মনোভাব এবং অন্যের সেবাকে নিজের পরিচয় ও জীবনধারার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। তিনি কয়েক দিনের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ফল নন; বরং এমন একটি শিক্ষামূলক ধারার ফল, যার সূচনা আশুরা থেকে, প্রকাশ আরবাঈনে এবং যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ন্যায়, মানবিক মর্যাদা ও আধ্যাত্মিকতার ভিত্তিতে একটি সমাজ নির্মাণ।

লেখা: হাসান রেজা

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha